প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানই ভবিষ্যতের  জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম উপায়


Published: 2021-06-19 17:42:13 BdST, Updated: 2021-09-28 08:38:28 BdST

 

বিজনেস ওয়াচ প্রতিবেদক

প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানই ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম উপায়। আজ শনিবার (১৯ জুন) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের শিল্পখাতের জ্বালানি উৎসের ভবিষ্যৎ : এলপিজি এবং এলএনজি’ শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মোঃ আনিছুর রহমান এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এর সদস্য (গ্যাস) মোঃ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী যথাক্রমে প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। ওয়েবিনারের স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, গত ৫ দশকে শিল্পখাতের গতিধারাকে চলমান রাখতে প্রাকৃতিক গ্যাস জ্বালানির অন্যতম যোগদান হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। তবে আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণের ফলে জ্বালানির চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির কারণে প্রায়ই শিল্পখাতে জ্বালানি সংকট দেখা যাচ্ছে। সরকার ঘোষিত ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শিল্পখাতের চাহিদামত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। সেই সাথে এখাতে পরিকল্পিত উপায়ে পরিবেশবান্ধব ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।শিল্পখাতে চাহিদামাফিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণে প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান বৃদ্ধির পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ও এলএনজি আমদানি এবং উৎপাদনের উপর আরো বেশি হারে গুরুত্বারোপের আহ্বান জানান ডিসিসিআই সভাপতি।

তিনি বলেন,  বর্তমানে আমাদের আভ্যন্তরীন চাহিদার ২% মেটানো হয় এলপিজি’র মাধ্যমে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে গৃহস্থালী ও শিল্পখাতে এলপিজি এবং এলএনজি-এর চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টানরশিপের মাধ্যমে স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিতকরণের আহ্বান জানান ঢাকা চেম্বারের সভাপতি। তিনি দ্রুততার সাথে এলপিজি ও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, পাশাপাশিএখাতের সার্বিক উন্নয়নে একটি সমন্বিত টেকসই কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জোরারোপ করেন।

প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মোঃ আনিছুর রহমান বলেন,সরকার গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং জকিগঞ্জে সর্বশেষ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, আশা করা যাচ্ছে, সেখান থেকে দীর্ঘসময় ধরে গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে, এর জন্য প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে।

তিনি বলেন, করোনা মহামারীকালীন সময়েও ১০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়েছে। অনশোরে সক্ষমতা থাকায় বাপেক্সের মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো অব্যাহত রয়েছে। এলএনজি ব্যবসায় ঝুঁকি কম থাকায় বর্তমানে সকলেই এর দিকে ঝুঁকছে, এলপিজি’র বাজার প্রায় ১২ লক্ষ টন এবং ২৯টি কোম্পানী স্থানীয় বাজারে এলপিজি অপারেটর হিসেবে কাজ করছে। তবে ৫৬টি কোম্পানীকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট জাহাজে এলপিজি আমদানি করায় খরচ বাড়ছে, তবে মাতারবাড়ীতে এলপিজি টার্মিনালের কার্যক্রম চালু হলে, এ খরচ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে।

তিনি বলেন, দেশীয় শিল্পখাতে এলপিজি’র ব্যবহার এখনও অনেক কম। তবে এলপিজি ও এলএনজি’র টার্মিনাল স্থাপন এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে দাম কমানো সম্ভব।  ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ লক্ষ মেট্রিকটন এলপিজি আমদানী হয়েছিল, যার মধ্যে ১% ব্যবহার হয়েছে শিল্পখাতে এবং সিরামিক, মটর সাইকেল, বাইকসাইকেল, স্টিল ও চা শিল্পেই বেশি ব্যবহার করা হয়। ইতোমধ্যে এলপিজি খাতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার মত বিনিয়োগ হয়েছে।

আনিছুর রহমান আরো বলেন, ব্যবসা বান্ধব হওয়ার জন্য প্রয়োজন হলে নীতিমালা ও আইন সংষ্কারকরা হবে। এলপিজি অপারেটদের অনুমোদনের জন্য ১৮ধরনের লাইসেন্স দরকার এবং বাৎসরিক নবায়ন ফি দিতে হয় ১ কোটির বেশি, যা কমানো প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথি’র বক্তব্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এর সদস্য (গ্যাস) মোঃ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন,বর্তমানে আমাদের গ্যাসের রিজার্ভ ৬টিসিএফ এবং সারাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য যে ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়নি। বর্তমানে ৩৩০০ মিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাসের মধ্যে নিজস্ব উৎপাদিত গ্যাসের ৭৪% আসে নিজস্ব খাত থেকে বাকী ২৬% আসে এলএনজি থেকে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালে দেশীয় উৎপাদন হবে ১৬.৫% এবং আমদানিখাত থেকে আসবে ৮৩%, সেক্ষেত্রে শিল্পখাতসহ সকল খাতে ব্যয় বাড়বে। এমন বাস্তবতায় অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সরকারের সাথে বেসরকারীখাতকেও এগিয়ে আসতে হবে।

মকবুল এলাহী বলেন, গ্যাস ব্যবহারে মিটার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে, সিস্টেম লস ও চুরি কামানো যেত, যার মাধ্যমেআরো ১০-১২ লক্ষ মিটার গ্যাস লাগানো যাবে, সেই সাথে দূঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে। এলপিজি পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবান্ধব এবং আমাদের দেশে বর্তমানে ১.২ মিলিয়ন টন এলপিজি ব্যবহৃত হচেছ। অনুষ্ঠানে পেট্রোবাংলা’র গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানী লিমিটেড-এর প্রাক্তন পরিচালক (অপারেশন) ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার সালেক সুফীওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিল্পখাতের ভবিষ্যত জ্বালানি হলো এলপিজি ও এলএনজি। এজন্য শিল্পখাতে প্রাথমিক জ্বালানী সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে আমাদেরকে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবাহরের যৌক্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। গ্যাস অনুসন্ধানে বর্তমানে বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ যুগোপযোগী নয় এবং অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের ৩০তম স্থানে রয়েছে। সহনশীল দামে এলপিজি এবং এলএনজি সরবরাহের লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের উপর তিনি জোরারোপ করেন।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বিজিএমইএ-এর সভাপতি ফারুক হাসান, বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফেকচার্স এসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান আমের আলী হোসেন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি-এরইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির ডীন অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এবং ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি’র সহকারী অধ্যাপক মোঃ শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী অংশগ্রহণ করেন।

অধ্যাপক মোঃ শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন,২০৫০ সাল নাগাদ সারাবিশে^ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৮৫% নাবায়নযোগ্য জ্বালানী উৎস হতে আসবে। যেখানে বাংলাদেশে ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎতের ৩০% নবায়নযোগ্য খাত হতে আসার পরিকল্পানা রয়েছে।

 বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফেকচার্স এসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান আমের আলী হোসেন বলেন, জ্বালানীর জন্য শুধুমাত্র একটি উৎসের উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়, সেলক্ষ্যে বিভিন্ন খাত হতে জ্বালানী উৎপাদন ও জ্বালানীর বহুমুখীকরণের উপর আরো বেশি হারে গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। এছাড়াও তিনি বাপেক্স কে আরো আধুনিকায়ন করা দরকার বলে মত প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশের পশ্চিমাঞ্চলে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় সে অঞ্চলে আশানুরূপ শিল্পায়ন হচ্ছে না।

অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানির দাম নির্ধারনের বিষয়ে সকলকে আরো প্রতিযোগি সক্ষম হতে হবে, এবং ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি মূল্যের যৌক্তিকীকরণ ও ক্ষেত্রবিশেষে মূল্য হ্রাসের আহ্বান জানান। তবে ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের স্বার্থে আমদের প্রাকৃতিক গ্যাসকে আরো বেশি প্রধান্য দেওয়া প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন। বিজিএমইএ-এর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, তৈরি পোষাক ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পখাতে গ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং টেক্সটাইল, ডাইং, স্পিনিং প্রভৃতি খাতে দেশের ৭-৮% গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।