মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০

যত চ্যালেঞ্জই আসুক, আমরা এগিয়ে যাব: মোহাম্মদ হাতেম


Published: 2023-01-26 02:17:48 BdST, Updated: 2024-02-27 02:03:51 BdST

বিশেষ প্রতিনিধি : ‘যত সংকটই বিশ্ববাজারে থাকুক না কেন, আমাদের রপ্তানির ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে, আমরা এগিয়ে যাব। যত চ্যালেঞ্জই আসুক, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন নিট পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিানি বলেন, সবাইকে অবাক করে দিয়ে পণ্য রপ্তানিতে চমকের পর চমক দেখিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। নভেম্বরের পর ডিসেম্বরেও পণ্য রপ্তানি থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। আগামী দিনগুলো কেমন যাবে?
চার-পাঁচ মাস আগে আমি বলেছিলাম, আমাদের অবস্থান অনেক শক্ত। আমরা বায়ারদের না বলার মতো একটা অবস্থা তৈরি করতে পেরেছিলাম। সেটা আমাদের জন্য প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতি ওলট-পালট করে দিল। যার কারণে বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দিল। সেল কমে গেল বায়ারদের, অর্ডার কমে গেল। এই পরিস্থিতিতে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দিকে আমাদের রপ্তানি গ্রোথ (প্রবৃদ্ধি) ভালো ছিল। প্রথম মাসে (জুলাই) প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৬ শতাংশ। দ্বিতীয় মাসে ২৫ শতাংশ পজেটিভ গ্রোথ ছিল। কিন্তু তৃতীয় মাসে এসে এটা সাড়ে ৭ শতাংশ নেগেটিভ গ্রোথ হয়। চতুর্থ মাসেও প্রায় নেগেটিভ। তবে আশার কথা হচ্ছে, পঞ্চম মাসে (নভেম্বর) এসে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে আরও ভালো হয়েছে।

গত ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৫২ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকেই এসেছিল ৪২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। শতাংশ হিসাবে মোট রপ্তানির ৮২ শতাংশই এসেছিল পোশাক খাত থেকে। আর চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) ২৭ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এই ছয় মাসে মোট রপ্তানির ৮৪ শতাংশের বেশি এসেছে পোশাক থেকে।

বিস্ময়কর হলো এই কঠিন বিশ্ব পরিস্থিতিতে শেষ দুই মাসে, অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বর দুই মাসেই ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় দেশে এসেছে। নভেম্বর মাসে এসেছে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। আর ডিসেম্বরে এসেছে আরও বেশি ৫ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে এর আগে কখনোই কোনো একক মাসে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসেনি। সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নানা বাধাবিপত্তি ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিদায়ী ২০২২ সালে রপ্তানি ভালো হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। নভেম্বর মাসে আমাদের রপ্তানি আয়ে রেকর্ড হয়। ডিসেম্বর মাসে সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড হয়। গত বছর (২০২২ সাল) তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে ৪৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যেটা আগের বছর ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। ১০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি বেড়েছে এক বছরে। এর কারণ আমরা করোনা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য অনেক কাজ করেছি; বিভিন্ন বাজারে গিয়েছি। আমাদের বড় বাজারগুলোতে গিয়েছি। এমার্জিং মার্কেটেও গিয়েছি।
রপ্তানি ধরে রাখতে পেরেছি, এর বড় কারণ হচ্ছে আমাদের কাঁচামালের দাম কিন্তু বেড়ে গেছে। তুলা, কাপড়, কেমিক্যাল সবকিছুর দাম বেড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেইট কস্ট বা কনটেইনার কস্ট কিন্তু অনেক বেড়েছে। ফলে আমাদের গার্মেন্টে ইউনিট প্রাইস অনেক বেড়েছে। পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছ। এ ছাড়া ভ্যালু অ্যাডেড অনেক প্রোডাক্টের অর্ডার নিতে পেরেছি। বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করতে পেরেছি। ফলে বাংলাদেশ এখন দামি পণ্যের অর্ডারও পাচ্ছে। আগে বাংলাদেশে ১৫ ডলারের জ্যাকেট হতো। এখন বায়াররা আমাদের এখানে ৩০-৪০ ডলারের জ্যাকেট অর্ডার করছে। আমরা নতুন মার্কেটগুলোতে ঢুকতে পেরেছি। বেশি দামি পণ্য রপ্তানি করতে পেরেছি। আবার পণ্যের দাম বেড়েছে। সব মিলিয়ে রপ্তানি বেড়েছে। তবে বর্তমান অস্থির বিশ্ববাজারে রপ্তানির এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে কি না- তা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।

এরকম একটা পরিস্থিতিতে গত নভেম্বের আমরা বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামের একটা সুন্দর অনুষ্ঠান ঢাকায় করেছি। একইসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের দ্বিবার্ষিক যে সম্মেলন, যেটা আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করেছি। এই দুই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের যে সক্ষমতা সেটা বায়ারদেরকে দেখানো হয়েছে।

আমরা সব সময় গর্বের সঙ্গে বলি বাংলাদেশ অনলি দ্য সেফেস্ট সোর্স অব ইনকাম। জাতিসংঘের ট্রেড সেন্টার থেকে এক মাসে এটা ঘোষণা দিয়েছে। তাদের প্রকাশনা থেকে প্রকাশও করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিতে সেফেস্ট সোর্স ইনকাম, গ্রিন ইন্ডাস্ট্রির কারণে। এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং বায়াররাও জানে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিকল্প আর কোনো দেশ নেই। এই পরিস্থিতিতে আমরা খুব আশাবাদী। যদিও এখন বিশ্ব অর্থনীতির সংকটকাল, আমাদের অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে আমাদের পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। জানি না আগামী দিনগুলো কেমন যাবে।

ডলার সংকটের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের অভ্যন্তরীণ ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকায় এলসি খোলার সুযোগ চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছিলেন। কেন এ সুবিধা চেয়েছিলেন?
ডলারসংকটের কারণে বিকেএমইএ দুই-আড়াই মাস আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আমরা নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর পক্ষ থেকে এই দাবি জানিয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। আমরা অপেক্ষা করছি, সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে একটা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত জানাবে। ঋণপত্র খোলার সময় ব্যাংকে ডলারসংকট পড়লে বাকিটা টাকায় বিল পরিশোধ করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আমরা আবেদন করেছি। এই অনুরোধ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়, স্বল্প সময়ের জন্য যতদিন ডলারসংকট থাকবে ততদিন টাকায় ঋণপত্র খোলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে জানিয়েছিল কোনো ব্যাংক ব্যাক টু ব্যাক এলসি পরিশোধের দায় মেটাতে বিলম্ব করলে এডি লাইসেন্স বাতিলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তখন ব্যাংক ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ ব্যাংকগুলো আগের ব্যাক টু ব্যাকের দায় পরিশোধ করতে বলছে। ব্যাংকের কাছে ডলারসংকট, আবার ঋণপত্রও খুলতে হবে। ফলে এর জন্য আমাদের আবেদন ছিল ডলারের পরিবর্তে টাকায় ঋণপত্র খোলার জন্য।

ঋণপত্র খোলা এবং মূল্য পরিশোধে ডলারের চাহিদা মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের রপ্তানি খাত। নিট সেক্টরের শতকরা ৮০ শতাংশ কাঁচামাল দেশীয় পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। সুতরাং বর্তমান ডলারসংকট মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে ঋণপত্র খোলা এবং এর মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি টাকায় ঋণপত্র খোলা হলে এ-সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে। ঋণপত্র ক্রয় এবং মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে, ডলার কনভার্সনের নীতিগত প্রক্রিয়ার কারণে আমাদের ডলার প্রতি ৭-৮ টাকার পার্থক্যের ফলে বিশাল অঙ্কের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ফলে এসব বিষয় বিবেচনা করে ঋণপত্র খোলা এবং মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে বাংলাদেশি টাকায় ঋণপত্র খোলা এবং মূল্য পরিশোধের সুযোগ দিলে এ সংকটের সময় আমাদের খুব সুবিধা হতো। রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে পারতাম আমরা।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের সুবিধা আছে কী?
অবশ্যই আছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ৫টা কারেন্সি অ্যাকসেপ্টেবল। ডলার, ইউরো, পাউন্ড, চায়না ইউয়ান-এগুলো গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের ভেতরে ব্যাংক টু ব্যাক যে এলসি করছি, সেটা কেন বাংলাদেশি মুদ্রা টাকায় করতে পারব না, সমস্যা কোথায়? আমি বুঝতে পারি না। এখন এক লাখ টাকা রপ্তানি আদেশের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক করতে হয় ৭৫ হাজার ডলারে। এটা যদি টাকায় করি, তাহলে ডলারের সংকট, ব্যাংকগুলোকে বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে, সেই কেনার ঝামেলা থেকে ব্যাংকগুলো মুক্ত থাকবে। দুই নম্বর হলো- এই কেনাবেচার মধ্যে দামের পার্থক্য, যেমন আমার এক্সপোর্টের ডলার ব্যাংক ১০০ টাকা দিচ্ছে। আবার আমি যখন কোনো পেমেন্ট করি তখন ১০৫ বা ১০৬ টাকায় কিনে দিচ্ছে। এই পার্থক্যের কারণে আমার বড় লোকসান হচ্ছে। এই ক্ষতিটাও কিন্তু তখন হবে না। তখন সুন্দরভাবে ব্যাক টু ব্যাকের দায় শোধ করতে পারব। আমরা নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশই লোকালি এলসি করি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান, বিকেএমইএর ৭০ শতাংশ ফ্যাক্টরি আছে, যাদের কোনো বন্ড লাইসেন্স নেই। তার মানে এই কোম্পানিগুলো ১০০ শতাংশই লোকালি করে। তাহলে তাদের এ সুবিধা দিতে অসুবিধা কোথায়? হ্যাঁ, একটা অসুবিধার কথা হয়তো বলবে, আমরা যাদের কাছ থেকে আনছি, তারা হয়তো বলবে, আপনারা যদি আমাকে বাংলা টাকা দেন, তাহলে আমাকে তো বিদেশ থেকে কাঁচামাল (র ম্যাটেরিয়াল) আনতে হবে ডলার দিয়ে। সেটা আমি পাব কোথায়?

আমাকে তো এখন ৭৫ হাজার ডলার কিনতে হচ্ছে। কিন্তু তার তখন হয়তো কিনতে হবে টোটাল ৩০ হাজার ডলার। স্পিনিং মিল, যারা আমার কাছে সুতা বিক্রি করছে, তিনি হয়তো এক লাখ ডলারের বিপরীতে ৪৫ বা ৫০ হাজার ডলারে সুতা দিচ্ছে। তো উনাকে হয়তো এই সুতার বিপরীতে ২০ থেকে ২৫ হাজার ডলারের কটন ইমপোর্ট করতে হচ্ছে। তাহলে তাকে এই কটন আনতে সর্বোচ্চ ২০ বা ২৫ ডলার কিনে পেমেন্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তিনি তো টাইম পাবেন। কিন্তু আমাকে যদি টোটালটা কিনতে হয়, তাহলে এক লাখ ডলারের বিপরীতে একবারে ৭৫ হাজার ডলার কিনতে হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো পারছে না, এটাও তো বুঝতে হবে। এখন কেমন পরিস্থিতি? আমার যে শিপমেন্টগুলো গিয়েছে, সেগুলোর পেমেন্ট বায়াররা দিচ্ছে না। যেমন আমার ব্যাংকের একটা ডকুমেন্টে দুই মাস আগে পেমেন্ট পাওয়ার কথা, আরও ১০-১৫ দিন আগে ইতালির কাস্টমার তার ব্যাংকের মাধ্যমে আমার ব্যাংকে মেসেজ পাঠিয়েছে, ৪-৫ মাস পরে দিতে চায়। এটা এক নম্বর যে, যেসব মাল গিয়েছে সেগুলোর পয়সা আমরা পাচ্ছি না। দুই নম্বর হচ্ছে, প্রচুর মাল আমাদের প্রত্যেকের ঘরে রেডি আছে, মাল শিপমেন্টে নিচ্ছে না। তিন নম্বর হচ্ছে- সামনে যে শিপমেন্ট যাওয়ার কথা, এগুলোর শিডিউল তারা পাঁচ থেকে ছয় মাস পিছিয়ে দিয়েছে। ফলে একটা সংকটের মধ্যে আমরা আছি। শিপমেন্ট যাচ্ছে কিন্তু পয়সা পাচ্ছি না। আবার শিপমেন্ট যাচ্ছে না। ফলে আমার দায় কিন্তু সময় মতো পরিশোধ করতে পারছি না। সারা বিশ্বেই কিন্তু এরকম একটা অ্যাবনর্মাল সিচুয়েশন চলছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন একটা সার্কুলার আমাদের জন্য কিন্তু ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আসছে। ব্যাংকগুলো এই সার্কুলার পাওয়ার পর বলছে যে, আগের ব্যাংক টু ব্যাংক পাওনা পরিশোধ করেন।

কিন্তু এখন তো রপ্তানির বিপরীতে ডলারের দাম বেশি পাচ্ছেন। এক বছর আগে প্রতি ডলারের বিপরীতে পেতেন ৮৫ টাকা। এখন পাচ্ছেন ১০০ টাকার বেশি। এতে আমাদের কী ধরনের সুবিধা হচ্ছে?
হ্যাঁ, স্বীকার করছি যে ডলারের দাম বেশি পাচ্ছি। কিন্তু এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে সবাইকে ভেবে দেখার অনুরোধ করছি। ব্যাক টু ব্যাক এলসির পাওনা পরিশোধ করতে গিয়ে আমাকে ১০৫-১০৬ টাকা দিয়ে ডলার কিনতে হচ্ছে। আমাকে যদি প্রতি মাসে ১০ লাখ ডলার ব্যাক টু ব্যাক এলসির দায় পরিশোধ করতে হয়, এই যে ৫ টাকা বা ৬ টাকার ডিফারেন্স, এর ফলে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়ই প্রো-অ্যাকটিভলি আমাদের সাহায্য করে। সে জন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। ইদানীং দুই-তিনটা ঘটনার জন্য আমরা মর্মাহত। যেমন- অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স আমাদের রপ্তানির ডলারের যে মূল্য তা ৯৯ টাকা নির্ধারণ করেছিল, সেটা গত সপ্তাহে ১০০ টাকা করেছে। আবার রেমিট্যান্সেরটা আগে ১০৮ টাকা করেছিল, সেটা এখন ১০৭ টাকা করেছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমার প্রশ্ন ডলার কেন ৭ টাকা পার্থক্য হলো? কী কারণে? এটা তো অন্যায়। রীতিমতো রপ্তানিকারকদের ডলারের টাকা লুণ্ঠন করে ব্যাংকগুলো বড়লোক হচ্ছে এখানে। লাভবান হচ্ছে ব্যাংকগুলো। এটা হতে দেয়া উচিত না।

বাংলাদেশ ব্যাংকই হবে একমাত্র ডলারের রেট নির্ধারণ করার অথোরিটি। কারণ, ওই ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন যদি করে তাহলে ফারুক হাসান বিজিএমইএর প্রেসিডেন্ট হিসেবে, আমি বিকেএমইএর প্রেসিডেন্ট হিসেবে বলতে পারি, আমাদের ডলারের রেট হবে ১১০ টাকা। তাহলে কি এটা বাংলাদেশ ব্যাংক মেনে নেবে? সে জন্য আমরা মনে করি, এটা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজার মনিটরিং করবে, কী রেট হওয়া উচিত তা করবে। সেটা টাইম টু টাইম চেঞ্জ হতে পারে। এ ছাড়া বিকেএমইএ, বিজিএমইএ, বাফেদা সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করা যেতে পারে। এই ক্রাইসিস মুহূর্তে আমি মনে করি একটা সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। সবাই মিলে এই সিদ্ধান্তগুলো হওয়া উচিত। যার যার মতো করে সিদ্ধান্ত দেবে, আর চাপিয়ে দেবে তা হবে না।

ব্যাংকাররা তো মনে করছেন, আমাদের হাত-পা তো বাঁধা। ব্যাংকের মাধ্যমেই এক্সপোর্ট করতে হবে। ডলার ব্যাংকের মাধ্যমেই আনতে হবে। এ ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। যেহেতু পা-হাত বেঁধে ফেলেছি, যা দেব তাই খেতে হবে, এই মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। ডলার তো কিনতে হচ্ছে যদি এলসি করতে হয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, আপনি তো ডলারে এক্সপোর্ট ও ইমপোর্ট করেন। কিন্তু আমার ডলারটা আসতে তো দেরি হচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে আমি যেটা এক্সপোর্ট করি সেটা ব্যাংকে দিচ্ছি। ব্যাংক প্রথমে ডলারটাকে বাংলা টাকায় নিচ্ছে। এরপর এই টাকা থেকে ডলার কিনে আবার ব্যাক টু ব্যাক পরিশোধ করছে। ফলে আমার এখানে লস হচ্ছে।

কোনো অবস্থাতেই ডলারের ক্রয় এবং বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই অবস্থায় এক টাকার বেশি ডিফারেন্স হওয়া উচিত না। অতীতে ৬০ পয়সা ছিল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যবসায়ীরা ও দেশের ১৭ কোটি মানুষ। এতে লাভবান ব্যাংকাররা। আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে কেন ব্যাংকাররা লাভবান হবেন। এটা হওয়া উচিত না।

এই সংকটের সময়ে একটা ইতিবাচক দিক লক্ষ্ করা যাচ্ছে। চীন, ভিয়েতনাম, এমনকি মিয়ানমার থেকেও অনেক অর্ডার বাংলাদেশে আসছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আমাদের প্রতি বায়ারদের দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই পজেটিভ। বাংলাদেশের ব্যাপারে নেগেটিভ কোনো কিছু নেই। তবে একটা ব্যাপারে তাদের নেগেটিভ দিক দেখি, সেটা হলো-একটা টি-শার্ট তারা চায়না থেকে কিনছে ২ ডলারে। কিন্তু যেই বাংলাদেশে আসে আমাকে বলা হয় এক ডলার বা ৮০ সেন্ট। কেন কম, এটার কোনো উত্তর নেই। দুই নম্বর দিক হচ্ছে- কমপ্লায়েন্স এবং সেফটির যতরকম ক্রাইটেরিয়া আছে, সব ফুলফিল করতে হচ্ছে। যত টাকা ইনভেস্ট লাগে করতে হচ্ছে। কোনো রকমের ছাড় দিচ্ছে না। যখনই প্রাইসের কথা আসে, তখনই বলে তোমরা সোর্সিং টিমের সঙ্গে কথা বল। আমরা হচ্ছি কমপ্লায়েন্স টিম। আমাদের সঙ্গে প্রাইস নিয়ে কোনো কথা নেই।

সোর্সিং টিমের সঙ্গে কথা বলি, তখন বলে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এখানে প্রাইস নিয়ে তোমাদের দরকষাকষি করার সুযোগ নেই। মানে এই ধরনের ডবল স্ট্যান্ডার্ড আমরা বায়ারদের মধ্যে লক্ষ করেছি।

কিছুদিন আগে আপনারা এবং বিজিএমইএ নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর কম দামে পোশাক বিক্রি করবেন না। সেই সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
সেই জায়গাতে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। একটার পর একটা বিভিন্ন ঝামেলার কারণে হয়ে ওঠেনি। বিজিএমইএ-বিকেএমইএ জয়েন্টলি একটা কমিটি করা হয়েছে। তারা কাজ করছে। আমরা মিনিমাম একটা প্রাইস বেঁধে দেব। এর নিচে কেউ সেল করতে পারবে না। যদি করে তাহলে তাকে ইউডি দেয়া হবে। এই ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশার কথা বলতে পারি, গত নভেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টসহ ফুল বোর্ড ঢাকাতে এসেছিলেন। বিভিন্ন বায়ার ও প্রতিনিধি এসেছিলেন। তাদের মনোভাব পজিটিভ ছিল। তারা বুঝতে পেরেছে যে, বাংলাদেশ একটা সেফ সোর্স কান্ট্রি। তারা বাংলাদেশ মার্কেট শেয়ার বাড়াতে চায়। অর্থাৎ এখানে যা ছিল সেটা থেকে তারা বেশি নিতে চায়। এগুলো যা হচ্ছে তা সবই পজিটিভ। আমরা মনে করি, আগামী দিনে এটা ভালো কিছু হবে।

বিদ্যুতের পর গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। এতে কী ধরনের সমস্যা হবে আপনাদের?
আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। একদিকে বায়াররা আমাদের পোশাকের ন্যায্য দাম দিচ্ছে না; অন্যদিকে আমাদের খরচ বেড়ে গেল। উভয়সংকটে পড়লাম আমরা। গত পাঁচ মাসে আমরা প্রত্যেকেই ক্যাপাসিটি বাড়ানোর দিকে ছিলাম। হঠাৎ যখন গ্যাসসংকট হলো। আমরা থমকে গিয়েছিলাম। এখন দাম বাড়ানো হলো। এই মুহূর্তে বিশ্বমন্দার চ্যালেঞ্জের চেয়ে আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে লোকাল সমস্যা। প্রথমত, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা। দ্বিতীয়ত, কাস্টমস ও এনবিআরের সমস্যা।

আমরা সরকারের কাছ থেকে পলিসিগত এই সাপোর্টগুলো যদি ঠিকমতো পাই, তাহলে বিশ্বমন্দার মধ্যেও এগিয়ে যাব। দেখেন, বাংলাদেশের ডেনিম সারা বিশ্বকে বিট করে আমেরিকার মার্কেটে এক নম্বর চাহিদায় রয়েছে। টোটাল এক্সপোর্ট বিশ্বের দ্বিতীয়তম স্থানে রয়েছি আমরা। আমেরিকার মার্কেটে সাড়ে ১৬ শতাংশ ডিউটি দিয়েও এগিয়ে যাচ্ছি। তার মানে হচ্ছে, যত সংকটই বিশ্ববাজারে থাকুক আমরা এগিয়ে যাব।

অতীতে আমরা সাপোর্ট পেয়েছি। তার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রী, ব্যাংক, এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সবার কাছে কৃতজ্ঞ। সবাই পলিসিগত সাপোর্ট দিয়েছেন বলে আমরা এতদূর আসতে পেরেছি। কিন্তু পলিসির মধ্যে মাঝে মাঝে যখন ঘুণে ধরে বা সমস্যা তৈরি হয় সেটা সময়মতো অ্যাডজাস্ট হয় না। তখনই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, অর্থমন্ত্রণালয়সহ সবাই যদি সহযোগিতা করে, যেমন এসএস কোড নিয়ে জটিলতা বা আদার্স কিছু বিষয় নিয়ে জটিলতা, সেগুলো না থাকলে এগিয়ে যাব।

তাহলে কী বলতে পারি যে, এই সংকটের সময়ে রপ্তানি বাড়বে; পোশাক রপ্তানির ওপর ভর করেই কী ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ?
দেখেন, আমরা কিন্তু বাধাবিপত্তি চড়াই-উৎরাই পেরিয়েই এই জায়গায় এসেছি। পোশাক রপ্তানি নিয়ে গেছি ৪৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। বিশ্বে এ পর্যন্ত যত সংকট তৈরি হয়েছে, বিশ্বমন্দা বা আর যাই হোক- সব কিছু মোকাবিলা করেই কিন্তু আমরা এগিয়ে চলেছি। ১৯৯৫ সালে প্রথমে আসল চাইল্ড লেবার ইস্যু, সেটা মোকাবিলা করেই আমরা এগিয়ে গিয়েছি। ২০০৫ সালে কোটামুক্ত বিশ্বে সবাই বলেছে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ বলেছে যে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট সেক্টর আর থাকবে না। আমরা পাল্টা চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম যে, না, বাংলাদেশে এর পরও থাকবে এবং আমাদের কথা সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। এরপর একটা বড় অর্থমন্দা গেল ২০০৮-০৯ অর্থবছরে। এর পরও কিন্তু আমাদের গ্রোথ আরও ভালোভাবে এগিয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা, রানা প্লাজা ইনসিডেন্ট, তার আগে তাজরিন ইনসিডেন্ট। এত বড় ঘটনার পরও দেশ কিন্তু এগিয়েছে। এর পরে আমরা বলেছিলাম, এই দুই দুর্ঘটনা বাংলাদেশের গার্মেন্টশিল্পের জন্য হবে একটা টার্নিং পয়েন্ট এবং তাই হয়েছে। আমার মনে আছে, ২০১৫ সালে তোফায়েল ভাইয়ের (সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ) নেতৃত্বে ওয়াশিংটনে কনগ্রেসম্যানদের সঙ্গে বসলাম। তারা শুরুতেই খুব আশ্চর্য হয়েছিল যে, এত বড় দুর্ঘটনার পরও বাংলাদেশের অ্যাপারেল সেক্টর এগিয়ে যাচ্ছে, এটা তাদের কাছে মিরাকল ছিল।

বাংলাদেশ সব সময় এ ধরনের মিরাকল করার জন্যই প্রস্তুত থাকে। বাংলাদেশের সাহসী উদ্যোক্তারা সব সময় এগিয়ে যায়। আমাদের সব সময়ই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। যত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ আসে তত শক্তি নিয়ে আমরা পরাহত করার চেষ্টা করি। তার ফলে আমরা রানা প্লাজার পরে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আজকে বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ডে হাইয়েস্ট গ্রিন ফ্যাক্টরির দেশ, প্লাটিনাম লিড সার্টিফাইড বাংলাদেশ, সেফেস্ট সোর্সেস কান্ট্রি বাংলাদেশ। এগুলো অ্যাচিভমেন্ট। আমরা গর্বের সঙ্গে বাইরে বলতে পারছি। সুতরাং এই ধরনের যত চ্যালেঞ্জই আসুক, আমরা এগিয়ে যাব। আরেকটা সুখবর হচ্ছে, দেড় শ কোটি মানুষের বিশাল বাজারের দেশ ভারতেও কিন্তু আমাদের পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে পাশের দেশটিতে আমাদের মোট রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরেও সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে। আমরা কিন্তু সেখানে ঢুকে গেছি। আমাদের বাজার কিন্তু আস্তে আস্তে বাড়ছে। এ জন্যই আমরা খুব আশাবাদী।

সূত্র : দৈনিক বাংলা

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।