ঢাকা-দিল্লী রুটে জেট এয়ারের ইচ্ছামতো ভাড়া


Published: 2017-03-16 00:51:48 BdST, Updated: 2021-09-28 07:45:46 BdST

 

বিওয়াচ ডেক্স: বাংলাদেশের জন্য দিল্লী নগরী নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারতের রাজধানী দিল্লী। ঐতিহ্য, কৃষ্টি, শিক্ষা, বাণিজ্য, চিকিৎসা, পর্যটন ইত্যাদি বিবেচনায় কলকাতার পর আশপাশের সকল শহরের চেয়ে বাংলাদেশীদের কাছে দিল্লী অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। ঢাকা থেকে দিল্লীর আকাশ পথ দু’ঘণ্টার। এই আকাশ পথে যাতায়াত করছে একটিমাত্র এয়ারলাইনস জেট এয়ার। ভাড়া ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। কখনও কখনও তা ৫০ হাজারও ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে ঢাকা থেকে প্রায় চার ঘণ্টার পথ কুয়ালালামপুর। আকাশ পথে ভাড়া মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। কারণ মনোপলি। ঢাকা-দিল্লী রুটে জেট এয়ারলাইনস ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করলেও যাত্রীদের কিছুই করার নেই। ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস চলাচল করে। যাত্রীদের সামনে বিকল্প থাকায় ভাড়াও আয়ত্তের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, দুই দেশের জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ রুটে কেন এই মনোপলি। কি এমন প্রভাবে বাংলাদেশ বিমানসহ দুই দেশের বিমান কোম্পানিগুলো একটি এয়ার লাইনসের কাছে এই রুটটি ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। বছরের পর বছর ধরে এই রুটে চলছে যাত্রীদের পকেট কাটার এই প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ বিমানের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন অবশ্য বলেছেন, শীঘ্রই এই রুটে বিমান চলাচল করবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে কোন এয়ারলাইনসের জন্য ঢাকা থেকে দিল্লী একটি প্রেস্টিজিয়াস রুট। এই রুটে যাত্রীর অভাব নেই। ট্যুরস এ্যাসোসিয়েশন্স অব বাংলাদেশ টোয়াবের সভাপতি তৌফিক আহমেদের ভাষ্যমতেÑ শুধু পর্যটন নগরী নয়, চিকিৎসা, ব্যবসা ও দাফতরিক কাজেও দিল্লী বেশ গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন কমপক্ষে পনেরো হাজার ভিসা ইস্যু করছে। এর বেশিরভাগ কলকাতাগামী হলেও দিল্লীর যাত্রী নেহায়েত কম নয়। প্রতিদিন বেশ কয়েকটি ফ্লাইট হলেও যাত্রী পাওয়ার কথা। কি কারণে এয়ারলাইনসগুলো দিল্লী রুটের প্রতি অনিহা তা বোধগম্য নয়।

এ সম্পর্কে বিমানের এক সাবেক পরিচালক বলেন, দিল্লীগামীদের এক চতুর্থাংশও যদি আকাশ পথের যাত্রী ধরা হয় তাহলেও কয়েকটি এয়ারলাইনসের ব্যবসা সন্তোষজনক হওয়ার কথা। বাংলাদেশ বিমান কেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ফ্লাইট চালু করছে না সেটা অবশ্যই রহস্যজনক। জেট এয়ারওয়েজ একচেটিয়া বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করছে আর কেনই বা অন্য এয়ারলাইনস এ রুটে ফ্লাইট অপারেট করছে না সে প্রশ্ন সাধারণ যাত্রীরও।

অতীতে বাংলাদেশ বিমানসহ একাধিক এয়ারলাইনস এই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। এ সময় তাদের ব্যবসাও ভাল ছিল। এই রুটে বিমান তখন রমরমা ব্যবসা করত। এক সময় সেটা বন্ধ হয়ে যায়। আবার ২০১৩ সালের ২৩ মে এ রুটে বিমানের ফ্লাইট চালু করা হয়। একটি ৭৩৭ বোয়িং উড়োজাহাজ দিয়ে সপ্তাহে দুটো ফ্লাইট অপারেট করা হতো। ঢাকা-দিল্লী-ঢাকার ভাড়া ছিল ২২ হাজার ৪শ’ টাকা। যাত্রীও মোটমুটি বেশ ভালই হতো। হঠাৎ মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৪ সালের জুনে লোকসানের অজুহাতে বিমান দিল্লী ফ্লাইট স্থগিত করে দেয়। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত বিমান এ রুট বন্ধ রেখেছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শুধুই লোকসান নাকি অন্যকিছু সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। আর এ সুযোগে জেট এয়ার ঢাকা থেকে একচেটিয়া দিল্লী যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে চড়া দামের টিকেট বিক্রি করে। জেট এয়ার ছাড়া আর কোন এয়ারলাইনস এই রুটে ফ্লাইট চালু করতে পারছে না। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ আশীষ রায় চৌধুরীও মনে করেন, যদি অন্য এয়ারলাইনসগুলো এগিয়ে আসত তাহলে ভাড়াও কম হতো।

কেন বিমান ফ্লাইট চালু করছে না জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, অনেক আগেই এ রুট চালু করার জন্য বিমানকে নির্দেশ দিয়েছি। বিমান বলছে উড়োজাহাজ স্বল্পতার কারণে এখনই এ রুট চালুর সম্ভাবনা নেই। তবে খুব শীঘ্রর উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তখন চালু করা হলে একচেটিয়া ব্যবসা আর কেউ করতে পারবে না। রবিবার বিকেলে মন্ত্রণালয়ের নিজ অফিসে মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন যখন দিল্লীর ফ্লাইটে জেট এয়ারওয়েজের একচেটিয়া চড়া দামের টিকেট বিক্রি নিয়ে কথা বলছিলেন তখন তার সামনেই ছিলেন টোয়াব নেতা তৌফিক আহমেদ ও তার পুত্র আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ। তারা জানালেন, আগামী ২৩ মার্চ ঢাকা-দিল্লী রুটে তারা স্পাইস জেট এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চালু করছেন। মন্ত্রী নিজেই তা উদ্বোধন করবেন। স্পাইস জেট চালু হলে কিছুতেই ঢাকা দিল্লী ঢাকা রুটের ভাড়া ২৬ হাজার টাকার বেশি হবে না।

প্রতি মাসেই ব্যবসায়িক কাজে দিল্লী যেতে হয় এমন একজন হাসান চৌধুরী বলেন, জেট এয়ারওয়েজের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে এ রুটের যাত্রীরা। ৪০ হাজার কেন এখন যদি হঠাৎ, কোন ঘোষণা ছাড়াই কাল থেকে এ ভাড়া ৫০ হাজার টাকা করা হয় তাহলেও করার কিছু নেই। তিনি বলেন, বেসরকারী এয়ারলাইনসগুলো ঢাকা থেকে কলকাতা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, দুবাই, মাসকট ও ব্যাংকক ফ্লাইট চালু করছে। প্রতিযোগিতা থাকার কারণে এসব রুটের ভাড়াও আয়ত্তের মধ্যে। দিল্লী রুটে তারা কেউ ফ্লাইট চালাতে আগ্রহী কেন নয় এটি একটি প্রশ্ন। সবাই কি গোপন সমঝোতার অংশ নাকি অন্য কোন প্রভাব? এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসরকারী ইউএস বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অন্যরা কেন চালু করছে না সেটা বলতে পারব না। তবে আমরা ইউএস বাংলা দিল্লীতে ফ্লাইট চালুর জন্য সিভিল এভিয়েশনের কাছে আবেদন করেছি। এখনও কোন সাড়া মিলেনি। অনুমতি পেলে আমরা অবশ্যই ফ্লাইট চালু করব।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঢাকা দিল্লী রুটটি খুবই লাভজনক। প্রতিদিন ঢাকা থেকে প্রচুর যাত্রী ব্যবসা, চিকিৎসা, ভ্রমণ ও সরকারী কাজে দিল্লী যাতায়াত করছেন। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী একমাত্র এয়ারলাইনস বিমান বাংলাদেশ এক সময় এ রুটে ফ্লাইট অপারেট করত। ভাল যাত্রী পেলেও হঠাৎ করে বছর দুয়েক আগে লোকসানের অজুহাতে তা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। দুই ঘণ্টার আকাশ পথের ভাড়া বাবদ জেট এয়ারওয়েজের বিপরীতে ১০ হাজার টাকা কমে ৩০ হাজার টাকাও ভাড়া নেয়- আর যদি ফ্লাইটের লোড ফ্যাক্টর অর্ধেকও হয়-তবুও সেটা লাভজনক হয়। তারপরও বিমান কেন এ রুট বন্ধ করল সেটা রহস্যজনক। অথচ বিমান এখন ইয়াংগুন রুটের মতো অপ্রচলিত রুটে ফ্লাইট চালাচ্ছে। কলম্বো, মালের মতো অপ্রচলিত রুটে ফ্লাইট চালানোর চেষ্টা করছে। ব্যবসা সফল দিল্লী রুটে বিমান এখনও ফ্লাইট চালু করে লাভের মুখ দেখতে পারে।

জানতে চাইলে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মোসাদ্দিক আহমেদ বলেন, জেট এয়ারওয়েজ নানা কারণে দিল্লীর যাত্রী বেশি পায়। প্রথমত জেট ঢাকা থেকে শুধু দিল্লীর যাত্রীই বহন করছে না। সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন যাত্রীকে অনওয়ার্ড ফ্লাইটের কানেকশন দেয় নতুবা নিজেরাই ক্যারি করে। বিমান তো সেটা পারছে না। বিমান এক সময় সপ্তাহে দুটো করে ফ্লাইট চালাত। তারপরও তেমন যাত্রী পেত না। তবে এ রুটে বিমান খুব শীঘ্রর ফ্লাইট চালু করবে।

ঢাকা থেকে চার ঘণ্টার পথ কুয়ালালামপুর যেতে ভাড়া লাগে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। আর দুই ঘণ্টার পথ দিল্লীর ভাড়া কেন ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা জানতে চাইলে মোসাদ্দিক আহমেদ যুক্তি দেখান, এটা দূরত্বের ওপর নির্ভর করে না। যেমন ঢাকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নিউইয়র্ক যেতে আসতে সময় লাগে ৩৪ ঘণ্টারও বেশি। কয়েকটি এয়ারলাইনস তো মাত্র ৭০০ ডলারেও টিকেট বিক্রি করছে। এটা এয়ারলাইনসের একান্তই নিজস্ব পলিসি। এখানে কারোর হস্ত্েক্ষপ চলে না। কারোর কাছে জবাবদিহি করার মতোও বিষয় এটা নয়। অন্য কোন এয়ারলাইনস যদি না চালায়, তাহলে একক এয়ারলাইনস তো একচেটিয়া ভাড়া নেবেই।

বিমানের মার্কেটিং শাখার মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ আহসান কাজী জানান, জেট এয়ারওয়েজ ঢাকা থেকে প্রতিদিন একটি ফ্লাইট অপারেট করছে। তাদের যাত্রীর বেশিরভাগই ট্রানজিট। মোট যাত্রীর অধিকাংশই দিল্লী থেকে জেট এয়ারওয়েজে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যায়। বিমানের ফ্লাইটেও ঢাকা থেকে দিল্লী নিয়ে সেখান থেকে কুয়ালালামপুর হংকং ও ব্যাঙ্কক পাঠাত। দিল্লী রুটে জেট এয়ারওয়েজের চড়া দামে টিকেট বিক্রি ন্যায়সঙ্গত কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। কোন রুটে কেউ যদি একাই থাকে সে তার মতোই নিজস্ব মার্কেটিং পলিসি ঠিক করবে। বছর দশেক আগে টিকেট বিক্রির বিষয়ে আইএটিএ-এর একটা পলিসি ছিল। তখন অযৌক্তিক ভাড়া কেউ বাড়ালে জবাবদিহি করতে হতো। এখন সেটা অকার্যকর হয়ে গেছে। যে যার পলিসি অনুযায়ী ‘ডিমান্ড এন্ড সাপ্লাই’ এর ওপর ভিত্তি করে ভাড়া কম বেশি করে। ডিমান্ড বেশি থাকলে ভাড়া বাড়বে, কম থাকলে কমবে। জেট এয়ারওয়েজ এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে।

সূত্রঃজনকণ্ঠ

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।