শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে আগামী এক বছরে ৬৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে প্রাণ-আরএফএল


Published: 2023-10-15 12:39:56 BdST, Updated: 2024-07-13 06:34:55 BdST


নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল পণ্য, টয়লেট্রিজ, ফার্নিচার, নন- লেদার আইটেম, মেডিকেল অ্যাপ্লায়েন্সসহ নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্প পার্ক ও কারখানা গড়ে তুলেছে। এরই অংশ হিসেবে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুরে গড়ে তোলা হয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সবচেয়ে বড় স্থাপনা হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। প্রায় ৩০০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত শিল্প পার্কটির নির্মাণ নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১১ সালে, উৎপাদন শুরু হয় ২০১৩ সালে এবং আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয় ২০১৪ সালে। ইকোনমিক রিপোর্টাস ফোরাম [ইআএফ] এর সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং ডাইরেক্টর কামরুজ্জামান কামাল এসব কথা জানান।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অন্যতম উদ্দেশ্য গ্রামীণ এলাকার জনসাধারণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কোন কারখানা বা শিল্প পার্ক স্থাপনের সময় এ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাছাড়া জ্বালানির সহজলভ্যতা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুর ছিল অত্যন্ত অবহেলিত এলাকা। এখানকার মটি ছিল অনুর্বর, কৃষিকাজ করা সম্ভব ছিল না। ফলে এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল খুবই কম। এটিকে বিবেচনায় নিয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত দেশের ব্যবসায়ীদের এ অঞ্চলে শিল্প কারখানা গড়ে তোলার আহবান জানান এবং শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। গ্যাস সরবরাহ, ভূমির সহজলভ্যতা ও ঢাকা থেকে বেশি দূরে না হওয়ায় অনেকে এখানে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন । আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রাণ-আরএফএল এ অঞ্চলে সর্বপ্রথম কারখানা স্থাপন করে। প্রাণ-আরএফএলকে অনুসরণ করে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান এখানে কারখানা স্থাপন করেছে।

এরই মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ছাড়াও স্কয়ার, যমুনা, আরএকে, স্টার সিরামিকসহ অনেক প্রতিষ্ঠান শিল্পকারখানা গড়ে তুলেছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে এ এলাকার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিক সহযোগিতার ফলে এক সময়ের অবহেলিত এলাকাটি একটি শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। প্রাণ-আরএফএল এ অঞ্চলে শিল্প পার্ক স্থাপনের আগে তেমন শিল্পায়ন না হওয়ায় বেকারত্ব বেশি ছিল। হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রার নয় বছরের মাথায় এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল এর হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন হয়। এর মধ্যে যেমন রয়েছে নিত্য ব্যবহার্য পণ্য, তেমনি রয়েছে সেসব পণ্য যেগুলো একসময় ব্যাপক পরিমাণে আমদানি করা হতো। তাছাড়া রয়েছে এমন সব পণ্য, যার বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এছাড়া এ পার্কেই গড়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ প্লাস্টিক রিসাইক্লিং প্লান্ট। এ শিল্প পার্কে প্রাণ- আরএফএল গ্রুপের পণ্য ছাড়াও কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত হয় বিশ্বের খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে কোকাকোলা ও জিলেট।

এ শিল্প পার্কে বর্তমানে ৪৭টি প্রোডাকশন লাইন রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ফ্রুট ড্রিংক, বেভারেজ, ক্যান্ডি, লিকুইড গ্লুকোজ, বিস্কুট, কনফেকশনারি, ট্রান্সফর্মার, ইলেকট্রিক ক্যাবলস, ফ্যান, মেলামাইন, বাইসাইকেল, এমএস ও জিআই পাইপ, রিসাইক্লিং পণ্য, টয়লেট্রিজসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হচ্ছে। নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনের ফলে এ স্থাপনাটি দেশের সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ শিল্প পার্কে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া আয়তনের দিক থেকে এটি দেশের বেসরকারি পর্যায়ে অন্যতম বড় শিল্প পার্ক।

এখানকার উৎপাদিত পণ্য বর্তমানে বিশ্বের ১৪৫টি দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। এ পর্যন্ত এ শিল্প পার্কে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী। কারখানায় কর্মরত লোকবলের প্রায় ৮০ ভাগই স্থানীয়। এখানে কাজ করা ছাড়াও স্থানীয় জনগণের একটি অংশ এ শিল্প পার্কে নানা ধরনের পণ্য সরবরাহের সাথে যুক্ত। তাছাড়া হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ককে কেন্দ্র করে বাজারসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমেও প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

এ পর্যন্ত এ শিল্প পার্কে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ৬,৩০০ কোটি টাকা। তাছাড়া আগামী এক বছরে প্রায় ৬৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। এ অর্থ বিভিন্ন প্রোডাকশন লাইনের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন প্রোডাকশন লাইন চালুতে ব্যবহার করা হবে। রয়েছে পোলট্টি, বেকারি, নুডলস, গ্লাসওয়্যার, রিসাইক্লেল পণ্য, ফিটিংস, সুইচ এন্ড সকেট, স্টেশনারি, ক্যাবলস, বাইসাইকেল বিনিয়োগের ফলে প্রায় ৩,০০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবেশের সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে প্রাণ-আরএফএল। এ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে বর্তমানে ৫টি ইটিপি রয়েছে যার মাধ্যমে প্রায় দৈনিক ১ কোটি ৬ লাখ লিটার তরল বর্জ্য পরিশোধন করা সম্ভব, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৬০-৬৫ লাখ লিটার তরল বর্জ্য উৎপাদিত হয়। লিকুইড বর্জ্য ইটিপি এর মাধ্যমে পরিশোধন করা হয় আর সলিড বর্জ্য দিয়ে জৈব সার তৈরী করা হয়। এছাড়াও রয়েছে একটি জিরো ডিসচার্জ প্লান্ট, যার মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে বারবার ব্যবহার করা হয়।

কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শায়েস্তাগঞ্জ এলাকায় উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে গ্রুপটি। আধুনিক সুযোগ- সুবিধাসহ কারখানা সংলগ্নে একটি স্কুল স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে এই স্কুলে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এছাড়া বেশ কিছু স্কুলে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান, রাস্তাঘাট নির্মাণ, পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া এ এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সান হেলথ কেয়ার হাসপাতাল।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।