তরল স্বর্ণ হতে পারে বাংলাদেশের আগর-আতর


Published: 2022-03-03 16:44:17 BdST, Updated: 2022-05-25 07:05:45 BdST


মোঃ জয়নাল আব্দীন:আগরকে মালয়শিয়াতে গাহারো, জাপানে জিংকুহ, জার্মানীতে অ্যাডলারহুল্জ, ফ্রান্সে বয়েস ডিঅ্যাজল্স, চীনে চেন ঝিয়াং, ডুবাইতে ঊদ, ইন্দোনেশিয়ায় গাহারো বা ঈগলঊড নামে ডাকা হয়। আগর মূলত একটি অতিসুগ্রাণ বিশিষ্ট কাঠ যা উদ্ভিদের অ্যকোইলারিয়া গোত্রের থাইমেলাইসেস পরিবারভূক্ত। বিশ্বব্যাপি আগরের প্রায় ১৫টি প্রজাতি রয়েছে। আগর মূলত: চারটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে বেচাকেনা করা হয়, যথা আগর কাঠ, আগর অয়েল বা আতর, আগরের ছোট ছোট টুকরা এবং আগরের পাউডার ইত্যাদি। অতি মূল্যবান আগরের এই সকল পণ্য প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই সমাদ্রিত হয়ে আসছে। শুধু মুসলমান, বৌদ্ধ বা সনাতন ধর্মই নয় প্রাকৃতিক আগর-আতরের গুনাগুন চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বিশেষকরে আয়োর্বেদ ও হোমিওপ্যাথিতে এর বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। সুগন্ধি শিল্পে আগরের বিশেষ অবস্থান আরব থেকে ফ্রান্স সকল ধারাতেই সুউচ্চ।
আগর উৎপাদনে এগিয়ে থাকা দেশগুলো হলো: ভারত, উন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, হংকং, অস্ট্রেলিয়া, লাউস, চীন, মায়ানমার, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় ও কিছু আগর উৎপাদন হয় যা বিশ্বের উল্লেখিত দেশসমূহের তুলনা যৎসামান্ন। বিশেষকরে বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে আগর-আতর শিল্পের একটি শিল্পগুজ্ছ বা ক্লাস্টার রয়েছে যেখানে প্রায় ১২০-১৫০টি আগর আতর কারখানা রয়েছে। যারা বিগত ৪০০ বছর যাবৎ বংশানুক্রমে এই শিল্পের সাথে জরিত এবং শতভাগ রপ্তানীমূখী এই শিল্পের অগ্রগতিতে সম্পূর্ণ ব্যক্তিখাত থেকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সুজানগরে উৎপাদিত আগর-আতর ভারতের মুম্বাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের ডুবাই, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত এইসকল দেশে রপ্তানী হয়ে আসছে।
আগরের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হচ্ছে প্রধানত দুইটি অঞ্চল, একটি হচ্ছে উত্তর পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ান, জাপান ও দক্ষিন কোরিয়া অন্যটি হলো মধ্যেপ্রাচ্যের আরব দেশসমূহ। বাংলাদেশের আগর আতর মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশসমূহে রপ্তানী হলেও তাইওয়ান বা জাপানের বাজারে এখনো যাচ্ছে না। আগর কাঠের গুনাগুনের ওপর ভিত্তিকরে এই কাঠের মূল্য কেজি প্রতি ২০ মার্কিন ডলার থেকে শুরুকরে ৬০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। একই সাথে আগর-আতরের মূল্য গুনাগুনের ওপর ভিত্তিকরে কেজি প্রতি ১০ হাজার মার্কিন ডলার থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কেজি প্রতি মূল্যের এই তালিকা থেকেই সহজে অনুধাবন করা যায় আগর আতর কত মূল্যবান পণ্য হতে পারে বাংলাদেশের মত একটি দেশের জন্য।
আগর বা ঊদ কে ”উড অব গড” নামে ও বিবেচনা করা হয়। এখন থেকে প্রায় ৩ হাজার বছর পূর্বেও মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও জাপানে এর ব্যবহার পাওয়া যায়। বহু প্রাচীন গ্রন্থ ও ধর্মগ্রন্থেও আগর বা ঊদের উল্লেখ রয়েছে। যেমন কবি কালিদাসের একটি লেখায় উল্লেখ রয়েছে যে “সুন্দরী নারীরা নিজেদেরকে উৎসবের জন্য প্রস্তুত করছে, তারা চন্দনের হলুদ পাউডার মেখে, সুগন্ধি গোলাপজল দ্বারা নিজেদের দেহ দৌতকরে নিজেদেরকে সুগন্ধি কাঠ পুরিয়ে তার সৌরভে সুরভিত করছে”। এই সুগন্ধি কাঠটিই হলো আগর, যা পুরানো হলে সুগ্রাণ বেড় হয়।
এছাড়াও হিন্দু, মুসলমান, বুদ্ধ, খ্রিস্টান, তাউস ও সূফি এইসকল ধর্মীয় ভাবধারা ও সংস্কৃতির মধ্যে আগরের বিশেষ ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। যেমন গৌতম বুদ্ধের অনুসারিরা মনে করে আগরের সুগ্রাণ প্রার্থনার সময় মনযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সিদ্ধিলাভে বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। মুসলমানদের পবিত্র হাদিস গ্রন্থ সহিহ মুসলিমের মধ্যেও আগরের সুগ্রাণ –এর ব্যবহার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্ট এর মধ্যে আগরের নাম অ্যলোস হিসেবে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। ধর্মীয় ব্যবহার ছাড়াও আগর আর্য়ুবেদ, ইউনানি, আরব, তিব্বতি, সূফি ও চীনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে একটি ঔষধি উদ্ভিদ হিসেসে বিবেচিত হয়ে আসছে।
আগরের বহুমূখী ব্যবহারের মধ্যে প্রাকৃতিক আগর কাঠের সু-পিছ খুবই উচ্চ মূল্যে বিক্রি হয়, আগর কাঠের টুকরা সুগন্ধি তৈরীতে, কিছু চিপ্স আগর চা হিসেবে, আগরের পাউডার পসাধনী শিল্পে ব্যবহৃত হয়, কিছু আগর পাউডার প্রার্থনার সময় বুদ্ধ মন্দিরে পুরানো হয়, আগর অয়েল বা আতর প্রধানত উচ্চমূল্যের সুগন্ধি তৈরীর প্রধান কাঁচামাল, আগরের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার সুগন্ধি আরবে মানুষের শরীর সুগন্ধি, পোষাকের সুগন্ধি, ঘরের সুগন্ধি হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হয়, আগর কাঠের টুকরা দ্বারা প্রার্থনায় বসার আসর তৈরী করা হয় যেমন রোজারিউ বেড বুদ্ধ বিক্ষুদের কর্তৃক প্রার্থনা কালে বহুকাল যাবৎ ব্যবহৃত হয়ে আসছে যা আগর কাঠের টুকরা দ্ধারা তৈরী করা হয়, কিছু কিছু পানীয় তৈরীর উপকরণ হিসেবেও আগর ব্যবহৃত হয়, এছাড়াও আগর বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ তৈরীতে বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
বিশ্ব অর্থনীতির উত্থান পতনের সাথে সাথে আগরের দাম ও বিভিন্ন সময়ে উঠানামা করেছে বারবার। যেমন ১৮৮০ সালে উচ্চমাণের আগর প্রতি কেজি ১ ডলারে বিক্রি হয়েছিল, পরবর্তীতে ১৯০৫ সালে যার মূল্য দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়ে কেজি প্রতি প্রায় ২.২০ মার্কিন ডলারে উঠে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯২৫ সালে এর মূল্য পরে যায় কেজি প্রতি ৩০ সেন্ট এ, তবে পরবর্তীতে ২০০০ সালে একই পণ্য কেজি প্রতি ১,২০০ মার্কিন ডলার, ২০০৫ সালে কেজি প্রতি ২,৫০০ মার্কিন ডলার এবং বর্তমানে প্রকার ভেদে কেজি প্রতি আগরের বাজার মূল্য ১০,০০০ মার্কিন ডলার থেকে ৩০,০০০ মার্কিন ডলারে ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে। তবে করোনা ভাইরাস প্রদুর্ভাবের কারনে বিশ্বব্যাপি আগর বিক্রিতেও নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমানে বড় ব্যবসায়িরা আগর স্টক করে রেখে দিয়েছেন বিশ্ব বাজার পুনরায় আপন ছন্দে ফেরার অপেক্ষায়।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র আগর-আতর ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাগণের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে জানা যায় যে, বাংলাদেশের আগর-আতর শিল্পের প্রধান সমস্যা ও সম্ভাবনাসমূহ নিম্নরূপ:
১. সরকারের বিভিন্ন নীতিমালা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাতে আগর-আতর শিল্পের অনুপস্থিতি: জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬ এর মধ্যে আগর-আতরকে অগ্রাধিকার শিল্প ঘোষণা করা হলেও আগর শিল্পের উদ্যোক্তাগণের ব্যাংক ঋণ পেতে বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে, আগর-আতর শিল্পের জন্য অন্যতম যোগান হচ্ছে গ্যাসের সংযোগ, যা পেতে এবং গ্যাসের মূল্য তালিকা নিয়ে আগর শিল্পের উদ্যোক্তারা নানবিধ ঝামেলা ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। রপ্তানী প্রণোধনা পাওয়ার জন্যও আগর শিল্পের উদ্যোক্তারা বিবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন মর্মে জানা যায়। তাই, শতভাগ রপ্তানীমূখী আগর শিল্পের রপ্তানী ত্বরান্বিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক এর অর্থ্যায়ন নীতিমালা, প্রণোধনা প্রদান, জাতীয় রপ্তানী নীতিমালা, আমদানী নীতি আদেশ, জাতীয় শিল্পনীতি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ নীতিমালা ইত্যাদি সরকারী নীতিসহায়তার মধ্যে আগর-আতর শিল্পকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হলে এই শিল্পের দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
২. আগর-আতর শিল্পকে দাপ্তরীকীকরণের জন্য গত ৪০০ বছরেও উল্লেখযোগ্য কোন সরকারী উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে এই শিল্পের উদ্যোক্তাগণ মনে করেন। সুপ্রাচীন এই উচ্চমূল্যের শিল্প খাতের উন্নয়নে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আগর-আতরের গুনগত মান যাচাই করার জন্য প্রয়োজন পরীক্ষাগার স্থাপন করা। যেসকল দেশে আগর আতর রপ্তানী হয় সেই সকল দেশে আগর-আতরের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপিত হওয়ায় বাংলাদেশের আগর আতর রপ্তানীকারকগণ বিশেষ বাজার সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই সরকারের উচিত ঐসকল দেশের সরকারের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে বাংলাদেশের আগর আতরকে বিশেষ শুল্ক মুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদানের অনুরোধ করা। তাহলে বাংলাদেশ হতে দাপ্তরিক পথে আগর-আতরের রপ্তানী বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারও এই খাত থেকে উল্লেযোগ্য পরিমান আয় করতে সক্ষম হবে।
৩. সরকারী বাগানের আগর গাছ বিদেশী ক্রেতাদের নিকট বিক্রি না করে দেশীয় শিল্পকারখানার মালিকদের কাছে বিক্রি করা হলে মূল্যসংযোজনের পর দেশ অধিক পরিমানে রপ্তানী আয় করতে সক্ষম হবে। এছাড়াও এই শিল্পের সাথে জরিত কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্বস্ব কাজে দক্ষ করে তুলতে পারলে আগর-আগরের মান বৃদ্ধি পাবে এবং উৎপাদনের সময় সিস্টেম লস কমানো সম্ভব হবে। দেশীয় মানসনদ দেয়ার মাধ্যমে আগরের গ্রেডিং করে দেয়া হলে আরো উচ্চমূল্যে বাংলাদেশের আগর আতর রপ্তানী করা সম্ভব হবে।
পরিশেষে, আমরা বলতে পারি যে শতভাগ রপ্তানীমূখী উচ্চমূল্যের আগর-আতর বাংলাদেশের তরল স্বর্ণ হতে পারে আমাদের উল্লেখযোগ্য রপ্তানী পণ্য যদি আমরা আমাদের উদ্যোক্তাগণকে উত্তর পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ান, চীন, জাপান ও কোরিয়ার আগর বাজারের সাথে সংযোগ স্থাপন করে দিতে পারি। একই সাথে বর্তমান বাজার মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশ সমূহে আলোচনার মাধ্যমে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিতে পারি। অত:এব আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতির সফল বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে আগর-আতর হবে আগামীর অন্যতম প্রধান ও শতভাগ মূল্যসংযোজিত রপ্তানী।
মোঃ জয়নাল আব্দীন, একজন উন্নয়ন গবেষক ও লেখক

 

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।