শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক সতর্কবার্তা


Published: 2023-01-15 11:52:35 BdST, Updated: 2023-02-04 11:43:09 BdST


ড. মো. আইনুল ইসলাম

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ২০২২ সালের প্রথম দিক থেকেই সতর্ক করে বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্বের ৪৫টি দেশে তীব্র খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা বিশ্বের অন্তত ২৭৬ মিলিয়ন মানুষকে মারাত্মক খাদ্য সংকটে ফেলবে। জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তনিও গুতেরেসসহ কৃষিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতির অবনতির হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সর্বসাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ এখন যথাযথ পরিমাণ খাদ্য খেতে পারছে না। ৮৮ শতাংশ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় গত ছয় মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত হয়েছিল খাদ্যমূল্যের ক্রম-ঊর্ধ্বগতি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশের মানুষকে ২০২৩ সালে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন। তিনি কিছুদিন ধরেই তার বিভিন্ন বক্তব্যে ‘দুর্ভিক্ষ’ শব্দটির ব্যবহার করেছেন। যদিও বৈশ্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তথাপি বাংলাদেশ যাতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে না পড়ে সেজন্য তিনি সবাইকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করায় প্রধানমন্ত্রী সাধুবাদ পেতেই পারেন। কারণ, আমাদের শাসক শ্রেণী ও সুবিধাবাদী মহলের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে, সুদিন-দুর্দিন যা-ই হোক অর্থনীতির শক্তির পাশাপাশি খাদ্যশস্যের উৎপাদনের পরিমাণ স্ফীত ও ভোগের পরিমাণ কম দেখিয়ে মহাড়ম্বরে খাদ্যে স্বনির্ভরতা ও আর্থিক নিরাপত্তার কথা ক্রমাগত সাড়ম্বরে জানান দিয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী সংকটের এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী সে পথে যাননি। তবে এখানে লক্ষণীয়, যেকোনো দেশের সরকারপ্রধান তার দেশের অর্থনীতি নিয়ে কোনো কথা বললে জাতীয় অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবেই তার কোনো না কোনো প্রভাব পড়ে। দুর্ভিক্ষের সতর্কতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জনগণকে অর্থ সঞ্চয়েরও তাগিদ দিয়েছেন। অর্থনীতি শাস্ত্রের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত সঞ্চয়প্রবণতা অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি বাড়ায়, অর্থনীতির গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত করে। এ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী এসব শব্দ ব্যবহার করছেন, যা নিশ্চয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝা আমাদের জন্য জরুরি।

প্রবাদ আছে—টাকার পাখা আছে, টাকায় টাকা আনে। এর অর্থ হচ্ছে, টাকাকে যদি সঞ্চয় বা আবদ্ধ না করে উৎপাদনশীল কাজে লাগানো যায়, তাহলে তা বিভিন্ন হাত ঘুরে বাড়তি মূল্য নিয়ে আবার ফিরে আসে। অন্যদিকে যেকোনো দেশে তীব্র খাদ্য ঘাটতি বা দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ এলে তা মূলত দেশটির নাগরিকদের প্রধান খাদ্যের উৎপাদন, চাহিদা, সরবরাহ ও জোগানের অস্বাভাবিক অবনতিকে ইঙ্গিত করে। সর্বব্যাপ্ত সংকটের এ মুহূর্তে জনগণের সঞ্চয়ের বিষয়ে কিছু বলা অবান্তর। কারণ কভিড-১৯ অভিঘাতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতেই সঞ্চয় করার মতো অর্থ নেই, নুন আনতেই তাদের পান্তা ফুরায় অবস্থা, বরং খাদ্য পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত, যা ধান-চাল দিয়ে তৈরি। আর দ্বিতীয় পছন্দ গমের তৈরি রুটি ও অন্যান্য খাবার। এ দুটি খাদ্যের দেশী-বিদেশী উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির মর্মার্থ বোঝা সহজ হবে।

বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্ববাজার ব্যবস্থায় বৈশ্বিক পরিস্থিতি এড়িয়ে গিয়ে কোনো দেশের পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। বিশ্বের ৭৯৬ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকেরই প্রধান খাদ্য ধান-চালে তৈরি খাবার, যা তাদের দৈনিক ক্যালরি ভোগের ৫০ শতাংশ পূরণ করে। ২০২১ সালে বিশ্বে ৫০০ মিলিয়ন টনেরও বেশি চাল উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে চীনের ১৪৮ দশমিক ৩ এবং ভারতে ১২২ দশমিক ২৭ টন। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া ৩৫ দশমিক ৩ টন ও বাংলাদেশ ৩৪ দশমিক ৬ টন। অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য গম উৎপাদনে শীর্ষ তিনে রয়েছে যথাক্রমে চীন, ভারত ও রাশিয়া, যারা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় ৪১ শতাংশের ভাগীদার। চীন বিশ্বের বৃহত্তম গম, চাল ও আলু উৎপাদনকারী এবং ভুট্টা ও ইক্ষু উৎপাদনে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয়। গত ২০ বছরে চীন গড়ে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন টন করে গম উত্পন্ন করেছে, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশ। উৎপাদনের হার এমন হলেও চাল-গম রফতানির চিত্র বেশ ভিন্ন। ২০২১ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ চাল রফতানিকারক দেশ যথাক্রমে ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, বার্মা, কম্বোডিয়া, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে চীন, ভারত, ব্রাজিলসহ আরো কয়েকটি দেশ অন্যতম চাল-গম রফতানিকারী হলেও গম উৎপাদনে চতুর্থ ও চাল উৎপাদনে মাত্র ২ শতাংশের অধিকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে কৃষিপণ্যের শীর্ষতম আয় উপার্জনকারী এবং বিশ্ব অর্থনীতির কব্জাকারক হিসেবে চাল-গমসহ কৃষিপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের আর্থিক কারসাজি ও নীতির মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও খাদ্যপণ্য উচ্চমূল্যে বাজারজাত হয় ধনী দেশ কানাডা, মেক্সিকো, ইউরোপ, জাপান, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোয়। আর বাংলাদেশের চাল-গমসহ অন্যান্য প্রধান খাদ্যক্রয়ের উৎস ভারত, চীন, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা। এসব দেশের কৃষিপণ্য আমদানিতে সমস্যা হলে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া অথবা অন্য কোনো দেশ।

বাংলাদেশের বর্তমান চাল-গম পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের সকাল-দুপুর-রাত তিন বেলার প্রধান খাদ্য ভাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ১৭ কোটি মানুষের মাথাপিছু ১৫২ কেজি চালের প্রয়োজনীয়তা ধরে নিয়ে আমাদের বার্ষিক চালের চাহিদা ২ কোটি ৫৮ লাখ টন। এর সঙ্গে বীজ ও অপচয় এবং পশুখাদ্য বাবদ ১৫ শতাংশ যোগ করে মোট চালের প্রয়োজন ২ কোটি ৯৬ লাখ টন বা প্রায় ৩ কোটি টন। দৈনিক চালের চাহিদা আরো বেশি বিবেচনায় নিয়ে মাথাপিছু দৈনিক আধা কেজি বা বার্ষিক জনপ্রতি ১৮২ দশমিক ৫০ কেজি হিসেবে চালের চাহিদা দাঁড়ায় ৩ কোটি ১০ লাখ ২৫ হাজার টন। বীজ, অপচয় ও পশুখাদ্য হিসেবে আরো ১৫ শতাংশ যোগ করা হলে মোট চাহিদা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৭৮ হাজার টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৩০ লাখ টন, যার মধ্যে চাল ৩ কোটি ৬৬ লাখ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৫৫ লাখ টন, যার মধ্যে চাল ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন। চাল উৎপাদন ও চাহিদার এ পরিসংখ্যান ফলাও করে তুলে ধরে সুবিধাবাদী মহলের তরফ থেকে প্রায়ই বলা হয়, বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, প্রতি বছরই আমরা বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করি। ২০২০-২১ অর্থবছরে চাল আমদানি হয়েছে ১৩ দশমিক ৫৯ লাখ টন। ২০২২ সালে এরই মধ্যে চাল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ৭৭ হাজার টন। অন্যদিকে ভাত ছাড়া সারা দিন আমরা যা-যা খাই, তাতে গমের তৈরি খাবারই বেশি। দুই দশক আগেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেই পূরণযোগ্য যে গম গরিবের খাবার ছিল, চালের মূল্যের সমান হওয়াসহ নানা কারণে সব শ্রেণীর কাছেই এখন তা অনেকটা আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। দেশে গমের চাহিদা এখন কমবেশি ৭০ লাখ টন, কিন্তু আমাদের গমের উৎপাদন ১০-১২ লাখেই সীমাবদ্ধ। ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে যথাক্রমে ১০ লাখ ৯৯ হাজার, ১১ লাখ ৪৮ হাজার ও ১২ লাখ ৪৬ হাজার টন করে গম উৎপাদিত হয়েছে। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে গম আমদানি হয়েছে ৫৩ দশমিক ৪১ লাখ টন। বিশ্ববাজারে গমের সংকটে ২০২২ সালে আমদানি তুলনামূলক অনেক কমে এখন পর্যন্ত ২০ দশমিক ২৩ লাখ টন হয়েছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, চাহিদা পূরণে চলতি অর্থবছরে অন্তত ১ কোটি টন চাল-গম-ডাল আমদানি করতে হবে। কিন্তু এসবের আমদানি পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়, অনিশ্চিত; গত সাত বছরের মধ্যে একই সময়ের হিসাবে চলতি অর্থবছরে (২০২২-২৩ জুন-অক্টোবর) সবচেয়ে কম খাদ্য আমদানি হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম কমে যাওয়ায় ঋণপত্র খুলতে সমস্যা ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটে চাল-গম আমদানির উৎস কমে যাওয়াই মূলত এর কারণ। এর মধ্যে আবার যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে চালের উৎপাদন কমারও আভাস দিয়েছে। অক্টোবরে প্রকাশিত সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার ৩ কোটি ৫৬ লাখ টন চাল উৎপাদন হতে পারে, যা গত অর্থবছরের চেয়ে দুই লাখ টন কম। বাজার স্বাভাবিক রাখতে সরকার নিজে আমদানি করছে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও কম শুল্কে আমদানির বরাদ্দ দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ১৪ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। গমের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে পূরণ করতে হয়, যার প্রধান উৎস রাশিয়া-ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ চলতি অর্থবছরে দেশে ৭০ লাখ টন গম আমদানিরও আভাস দিয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশে গড়ে বার্ষিক ৬৪ লাখ টন গম আমদানি হচ্ছে। এনবিআরের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে গম আমদানি হয়েছে ৯ লাখ ৮৪ হাজার টন। গত অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন। এ হিসাবে আমদানি ৩৬ শতাংশ কমেছে। উপরন্তু রাশিয়া দিনকয়েক আগে ইউক্রেনের সঙ্গে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় করা গম রফতানিসংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশের পথে থাকা কয়েক লাখ টন গম কৃষ্ণ সাগরে আটকা পড়েছে। এসব কারণে ২০২৩ সালে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট নিয়ে সবার উদ্বেগ আরো জোরালো হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ ‘বাংলাদেশে সার সরবরাহ ও ব্যবহারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব’ শীর্ষক অক্টোবর-২০২২ প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের এমওপি সারের ২০ শতাংশ সরবরাহ কমানো হলে বোরো মৌসুমে ধান, গম ও রবি মৌসুমের অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ কমবে, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন ও নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলবে। ২০২২ সালের মার্চ থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ সারের বাজার ও প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম রেকর্ড হারে বাড়ছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশের নাইট্রোজেন সারের চাহিদার ৩১ শতাংশ, ফসফেটের ৫৭ এবং পটাশ (এমওপি) সারের ৯৫ শতাংশ পূরণ হয় বিশ্বের প্রধান সার রফতানিকারক রাশিয়া ও বেলারুশের মাধ্যমে। যুদ্ধের প্রভাবে ওই সারও যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে না, সেহেতু কিনতে হচ্ছে অন্য উৎস থেকে, যার মূল্যও অনেক বেড়েছে। যেহেতু দেশের মূল শস্য বোরো ধান সেচ ও রাসায়নিক সারনির্ভর, সেহেতু কৃষি উপকরণ অর্থাৎ ডিজেল-পেট্রলচালিত সেচযন্ত্র এবং রাসায়নিক সারের মূল্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাও এখানে বড় একটি নিয়ামক। বাংলাদেশ পেট্রল-ডিজেল শতভাগ ও রাসায়নিক সারের ৮০ শতাংশই আমদানি করে। দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ৬৯ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহূত হয়েছে, যার মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারই ৫৭ লাখ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রধান চার ধরনের সারের চাহিদা কমিয়ে ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টন নির্ধারণ করা হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, দেশে রাসায়নিক সারেও সংকট চলছে, চলবে।ads

যদিও বিগত ১০ বছরে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ লক্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে, উৎপাদন বেড়েছে ৩০ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু জনসংখ্যা তো প্রতি বছর বাড়ছে ২০ লাখ করে, আবাদি জমিও কমছে আট লাখ হেক্টর করে। উচ্চমাত্রার দারিদ্র্য, ব্যাপক হারে বৈষম্য বৃদ্ধি ও অনমনীয় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতাও এখন বড় দুর্ভাবনার বিষয়। সাধারণত খাদ্যনিরাপত্তা নিরীক্ষণে সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতিটি হচ্ছে, কী সংখ্যক জনগণ ক্ষুধার্ত আছে তাদের সংখ্যা নিরূপণ। এক্ষেত্রে দুটি প্রধান নিয়ামক হচ্ছে—১. অপুষ্টিতে আক্রান্ত জনগণের সংখ্যা নিরূপণ, ২. বয়সের তুলনায় ওজনহীন শিশুদের ব্যাপকতা গণনা। এ পরিমাপকগুলো বাংলাদেশের যে চিত্র তুলে ধরে, তা যথেষ্ট হতাশা ও উদ্বেগজনক। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে নাগরিকদের অনেক বিষয় জড়িত, যেমন অত্যধিক দুর্বলতা ও অপুষ্টি, অসুখের প্রকোপ বৃদ্ধি, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অক্ষমতা, অবশেষে অকালমৃত্যু। দেশে পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রধান কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য। দরিদ্র পরিবারগুলো যদিও কিছু পরিমাণ খাদ্যগ্রহণে সফল হয়, তবে তা তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট পূরণে ব্যর্থ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন বাংলাদেশ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের (এফপিএমইউ) একটি যৌথ গবেষণা মতে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ৩৬ শতাংশ এখনো খর্বকায় এবং শীর্ণকায় ১৪ শতাংশ। অপুষ্টির কারণে কম ওজন নিয়ে প্রতি বছর দেশে জন্মগ্রহণ করছে ৩৩ শতাংশ শিশু। পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশু এখনো পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এছাড়া বিভিন্ন বয়সী ৭৩ শতাংশ নারীর রয়েছে জিংক ও ভিটামিন ‘এ’ স্বল্পতা। দেশে পাঁচ বছর বয়সী প্রতি তিনটি শিশুর একটি খর্বাকৃতির। অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষেরা যেহেতু কম উৎপাদন শক্তিসম্পন্ন, তাই তারা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের এমন একটি অভেদ্য ও বিপজ্জনক চক্রের সৃষ্টি করে, যা জাতির জন্য একসময় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। জীবনের প্রারম্ভে কোনো শিশু অপুষ্টিতে আক্রান্ত হলে বাকি জীবনে তার কাছ থেকে উৎপাদনশীলতা আশা করা অন্যায়। সরকারি-বেসরকারি গবেষণায় স্পষ্টই বোঝা যায়, সার্বিকভাবে অপুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তহীনতার ঝুঁকি থেকে এখনো বের হতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ বিবিএসসহ তথ্য-উপাত্ত প্রণয়নকারী প্রায় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ভুলভাল আর সুবিধার প্রবৃদ্ধি তুলে ধরে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অভিযাত্রাকে দুর্বল করে যাচ্ছে। স্বাধীনতা লাভের ৫০ বছর পরও বাংলাদেশে আগামী কয়েক প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির আশঙ্কা সত্যিই জাতির জন্য ভীষণ বেদনাদায়ক।

নানা অপ্রাপ্তি, অসংগতি, আশঙ্কা সত্ত্বেও পরিশেষে বলা যায়, প্রথাগতভাবে যাকে আমরা দুর্ভিক্ষ বলে জানি, বাংলাদেশে তা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা সম্প্রদায়ের মাঝে অন্তত ২০ শতাংশ পরিবার সীমিত সামর্থ্যের কারণে চরম খাদ্য সংকটে পড়ে স্বল্প সময়ে অনাহার ও অপুষ্টিতে মৃত্যুমুখে পতিত হলে সেখানে দুর্ভিক্ষ চলছে বলে ধরে নেয়া হয়। যেমন ১০ লাখ মানুষের দক্ষিণ সুদানকে জাতিসংঘ সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষকবলিত বলে ঘোষণা করেছে সেখানকার গৃহযুদ্ধ, দীর্ঘকালীন তীব্র খরা ও উচ্চমূল্যের কারণে মানুষের খাদ্য সংকটে মৃত্যুর হার দেখে। তার পরও দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ও নানা পরিসংখ্যানে যেহেতু দুর্ভিক্ষ না হলেও বড় ধরনের খাদ্য সংকটের আভাস স্পষ্ট, তাই আমাদের সতর্ক হওয়া জরুরি। সতর্ক ও সচেতন হতে হবে এ কারণে যে দেশে ১ হাজার ৬০০ পরিবারের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮০ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ খাদ্যের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে, ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও কমিয়েছে, ঋণ নিচ্ছে ৬০ দশমিক ৮০ শতাংশ মানুষ, আর ৪৭ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ প্রোটিন খাওয়া কমিয়ে দিয়ে মাছ-মাংস এড়িয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে, কেউ কেউ তো তিন বেলার বদলে এক বেলা কি দুই বেলা করে খাচ্ছে, ১০ শতাংশ মানুষ শিশুখাদ্য কেনাও বন্ধ করেছে। সর্বোপরি দেশে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজন (বীজ, প্রাণী ও মত্স্যখাদ্য, শিল্প, অপচয় প্রভৃতি) বিবেচনায় ২০৩০ সালে চালের মোট চাহিদা হবে ৩৯ দশমিক ১ মিলিয়ন টন এবং ২০৫০ সালে ৪২ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। আর বর্তমান উৎপাদন ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ ও ’৫০ সাল নাগাদ চালের মোট জোগান হবে যথাক্রমে ৪৩ দশমিক ২ এবং ৫৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন। নীতিনির্ধারকরা নাগরিকদের ওপর গলার ফাঁসের মতো চেপে বসা উচ্চমূল্যস্ফীতি ও নানা ধরনের ঘাটতি নিয়ে ভবিষ্যতের ওই চাহিদা ও উৎপাদন কীভাবে নিশ্চিত করেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে খাদ্যের অধিকার যেহেতু একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত, তাই রাষ্ট্রকে অবশ্যই এ খাতে আর্থিক, বস্তুগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।ads

ড. মো. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।